‘খারাপ সময়, সেরা সময়’
১০ অক্টোবর: দেশ উত্তাল। দিল্লির যন্তর মন্তরে মাছি গলবারও জায়গা নেই। গোটা শহরকে মুড়ে ফেলা হয়েছে পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে। দিল্লির সমস্ত আন্তঃরাজ্য সীমান্ত রুদ্ধ। ইন্টারনেট বন্ধ। ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ; এমনকি বাজার-হাটও। বাতিল হয়েছে দিল্লিগামী প্রায় সমস্ত ট্রেন।
মুম্বই ফেরত আরশোলা-নেতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে বিমান থেকে অবতরণেরও সুযোগ দেওয়া হয়নি। দিল্লি বিমানবন্দরে দণ্ডায়মান বিমানে উঠে পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে। বেশ কয়েক ঘন্টা কেউ জানতেও পারেনি কোথায় তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে জানা যায়, তিনজনকে বিচ্ছিন্ন করে একেক জনকে একেক দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল— অভিজিৎ, আশুতোষ ও সৌরভকে যথাক্রমে গুরুগ্রাম, দ্বারকা ও মধ্য দিল্লি শহরের সংশ্লিষ্ট থানায়। তবুও ছাত্র-যুব ও জনতার বিপুল ঢল যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে চেয়েছে, পুলিশের তাড়া খেয়েছে বা গ্রেফতার হয়েছে। আনুমানিক ১০,০০০’এর উপর ছাত্র-যুব গ্রেফতার। ককরোচ দল ঘোষণা দিয়েছে, যন্তর মন্তরে যদি আসতে না দেওয়া হয় তাহলে যেখানে আটকানো হবে সেটাই যন্তর মন্তর হয়ে উঠবে। তাই হয়েছে। যন্তর মন্তরে আসতে না পেরে দিল্লি হাটে জড়ো হয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা নেহা বোরার নেতৃত্বে মিছিল করেছে। সেই মিছিলে যোগ দিয়েছেন প্রশান্ত ভুষণ, যোগেন্দ্র যাদব, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য সহ অন্যান্য দিল্লিবাসীরাও। সেই মিছিল থেকে নেহা বোরাকে আটক করেছে পুলিশ। গোটা শহর পরিণত হয়েছে এক সামরিক ছাউনিতে। দিল্লির বিভিন্ন সীমান্তে ব্যারিকেড করে আটকে রাখা হয়েছে যন্তর মন্তরে যোগ দিতে আসা হাজার হাজার জনতাকে।
১১-১২-১৩ অক্টোবর: কিন্তু তারপর? ১১-১২-১৩ অক্টোবর দিল্লি পিছু হটেনি। দিল্লির অবরুদ্ধ দশা কাটেনি! ১১ অক্টোবর রবিবার সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ বসেছে। বিচারপতিরা কয়েক দফা নির্দেশও দিয়েছেন— পুলিশ বেআইনি আটক করতে পারে না, জনপরিবহন ব্যবস্থাকে অকেজো করে রাখতে পারে না, এমনকি মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকারও কেড়ে নিতে পারে না। অথচ, দিল্লির ব্যবসা-বাণিজ্য, কাজকর্ম সব লাটে তুলে দিয়ে গোটা শহরকে অচল রাখা হয়েছে। কেন? তাদের কীসের ভয়? বিক্ষোভ আন্দোলনের জন্য চিহ্নিত যন্তর মন্তরে যুবসমাজকে জমায়েত হতে দিতে শাসকের এত আতঙ্ক কেন? এমনকি রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতর থেকেও শাসকের এই বাড়াবাড়িকে কড়া কূটনৈতিক ভাষায় নিন্দা করা হল। কাকস্য পরিবেদনা!
১২ অক্টোবর দিল্লি দেখল লক্ষাধিক জনতার অভূতপূর্ব জনজোয়ার। পরক্ষণেই যন্তর মন্তরকে আন্দোলনের নির্দিষ্ট স্থান হিসেবে দিল্লি পুলিশ বাতিল করল। ১৩ অক্টোবর সকালে যন্তর মন্তর থেকে গ্রেফতার করা হল আরশোলা নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস সহ বেশ কিছু প্রতিবাদীকে। সর্বশেষ খবর, তাঁদের পাঁচদিনের জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
গত প্রায় এক দশক ধরে আমরা শাসনের যে উগ্র রূপ দেখেছি তা আজ এক ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়েছে। মানুষকে দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস চূড়ান্ত তলানিতে এসে ঠেকেছে। শেষাবধি ক্ষমতা ধরে রাখতে নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে যে ভোট লুঠের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছিল, এসআইআর করে যে ভাবে দেশ জুড়ে কোটি কোটি নাগরিকের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং তা নিছক অভিযোগের প্রান্ত অতিক্রম করে যখন ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনে বামাল ধরা পড়েছে, তখন খুব স্বাভাবিক যে তা জনতার ধৈর্যের বাঁধকে ভেঙে দেবে। তদুপরি, দিনের পর দিন, জনসমাজে একে অপরের প্রতি ঘৃণা পোষণের যে রাজনীতি ও হিংসার চাষ চলেছে, সমস্ত বিশ্বাস ও আস্থাকে এক সংকীর্ণ ধর্মীয় রাজনীতির জাঁতাকলে ঠুসে দেওয়া হয়েছে, মানুষের মূল সমস্যাগুলিকে চরম অবহেলা করে দেশকে এক খাদের কিনারে নিয়ে আসা হয়েছে, তা ভুক্তভোগী মানুষের সহ্যের সহনশীলতাকে অতিক্রম করেছে। ফলে, এই চলমান অব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে যখন মানুষের সম্মতি আর আদায় করা গেল না, ২০২৪’এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল যখন শাসকের পক্ষে আশাতীত ভাবে খারাপ হল, তখন নির্বাচনে হেরাফেরি করে জেতা ছাড়া অন্য কোনও পথ খোলা থাকে কী! তাই, আইন বদল, তাই জ্ঞানেশ কুমার, তাই এসআইআর। আর এইভাবেই বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে নিরঙ্কুশ ‘জয়’ ছিনিয়ে নেওয়া।
এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু…
কিন্তু এই সব ঘটনাবলীর এক বঙ্গীয় তাৎপর্য আছে যা অভূতপূর্ব। রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয়ে গত এক দশকে এমনতর নবরূপী কাণ্ডকারখানার উদয় না হলে আমাদের ইতিহাস ও সমাজ পাঠ বরাবরের জন্য অসম্পূর্ণ থেকে যেত। আমরা বুঝতেই পারতাম না যে, আমাদের প্রগতিশীলতা ও উদারতাবাদে কতখানি খাদ আছে, সেখানে কী চরম ভণ্ডামির সহবাস। আমরা যতটা না দেখলাম, তার চেয়ে বেশি বিস্ময়াবিষ্ট হলাম।
যে বৃহত্তর পরিবারে বড় হয়েছি, যে বন্ধু পরিসরে ছোটবেলা থেকে অথবা পরবর্তীকালে দিন কেটেছে, যে সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করেছি বা করি, যে অগুনতি পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ত মেলামেশা, যে রাজনৈতিক সহযাত্রীদের সঙ্গ পেয়েছি— তাদের এক বড় অংশ কেমন জানি সহসা অচেনা ও ভূতুড়ে হয়ে গেল। এদের অধিকাংশই আবার উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত বা উচ্চবর্ণ-মধ্যবিত্ত গোত্রে পড়ে। এদের মধ্যে নিম্নবর্ণ-নিম্নবিত্ত যে কেউ নেই তা বলা যাবে না; কারণ, পশ্চিমবঙ্গের মতো অন্তত ৩০ শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যে উচ্চবর্ণদের এক বড় অংশ এখনও নিম্নবর্ণের প্রতি ঘৃণা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বহন করলেও মুসলমান-বিরোধিতার প্রশ্নে উভয়েরই বিত্তশালী অংশটির অনেকেই কতকটা এক হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে যদিও ঘৃণা ও বিভাজনের মতাদর্শ ও সাংস্কৃতিক পটভূমিটা তৈরি করে উচ্চবর্ণরাই (বরাবরের মতো), নিম্নবর্ণরা পিছু নেয়।
তাই সহসা দেখি, উচ্চকিত তথাকথিত সত্যজিৎ-ভক্ত কোনও ‘বন্ধু’ উদ্গীরণ করছে মুসলমানদের প্রতি তীব্র ঘৃণা, পরিপাটি ধোপদুরস্ত সহকর্মী ভদ্দরলোক আক্ষেপ করছে ‘ছোটলোক’দের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে, মহার্ঘ’ভাতা’ চাওয়া ‘বামপন্থী’ সরকারি কর্মচারী বেজায় ক্ষিপ্ত হচ্ছে ‘ঝি-কেলো মাগী’দের মাসে মাসে ‘ভাতা’ দেওয়ায়, বিবেকানন্দ-ভক্ত গরিব দরদী ছোটবেলার বন্ধু রাস্তার ধারে স্টল বা ঝাঁকি নিয়ে বসা লোকগুলোকে উচ্ছেদের ওকালতি করছে (অথচ নিজে রাস্তার ধারে গাড়ি পার্ক করে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাচ্ছে অথবা বাড়ির সামনে ফুটপাথ দখল করে বাগান করছে), ‘শিক্ষিত’ মধ্যবয়সী বাবু স্বপ্ন দেখছে, বড় বড় কর্পোরেট আধুনিক শিল্প এসে তার ঘরের ছেলেমেয়েদেরও নাকি চাকরি দেবে (যখন তথ্য বলছে, তার সম্ভাবনা ন্যূনতম), অতএব, জোরজবরদস্তি কৃষকের জমি কেড়ে ‘শিল্প গড়ায়’ নাকি অন্যায় নেই— এমনতর কূট ভাবনাসমূহের সামগ্রিক বাতায়নেই তো পুষ্ট হতে পারে আসলে যা চাই: এক দেশ, এক নেতা, এক দলের হিন্দু রাষ্ট্র। কারণ, চন্দ্রনাথ বসু’র উত্তরাধিকারীদের যে ধূর্ত ভাবনাগুলো ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল উনিশ-বিশ শতকের বঙ্গে সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের আধিপত্যে ও রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথের ভাবনার আলোকে, গত এক দশকের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের পুনরুত্থানে সেইসব চাপা পড়ে যাওয়া বিষাক্ত অনুভবগুলো লকলকে প্রকাশে ডানা মেলেছে।
উপরন্তু, পশ্চিমবঙ্গে যেহেতু ক্ষমতাসীন-বর্ণবাদ ব্যাপারটা ছিল অনাস্বাদিত, তাই এই খুল্লাম-খুল্লা সুযোগে উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্ত বাঙালিদের এক বড় অংশের মনে হল, মনুবাদীরা ক্ষমতায় এলে তাদের উচ্চবর্ণীয় যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যার মূল সুর মুসলমান ও নিম্নবর্ণীয়দের প্রতি স্বভাবজাত ঘৃণা ও তাদের কোণঠাসা রাখার বাসনা, তা বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু তারা কোণঠাসা হলে উচ্চবর্ণীয়দের আজকের সময়ে কী প্রত্যক্ষ লাভ হতে পারে তা ততটা পরিষ্কার না হলেও, রাজাবাজারে হেলমেট না পরে মুসলমানদের বাইক চালানো বন্ধ হবে (এটা সর্বজনীন সত্য কিনা তার বিচার না করেই), হাজার হাজার ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী’দের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যাবে (অথচ, ভোটের পর আর তাদের পাওয়া যাচ্ছে না, থাকলে তবে তো পাবে)— অন্তত এমন দু-একটা বায়বীয় মতামতে সকলে একমত হয়ে বেশ স্বর্গীয় সুখও পেল।
অর্থাৎ, বঙ্গের ইতিহাসে উচ্চবর্ণীয়দের মুসলমান-ঘৃণার যে ধারা প্রবাহিত ছিল তা কালের নিয়মে নির্বাপিত হয়নি; এমনকি চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলনের ফলে সে সবের প্রকোপ কিছু কমলেও তা বার বার পুনঃপ্রকাশিত হতে চেয়েছে। চাকরিজীবী উচ্চবর্ণীয় ভদ্দরজনেরা ঘরে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের ছবি রেখে তাঁদের দু’ বেলা প্রণাম করলেও তাঁদের মূল বাণী ‘সর্বধর্মসমন্বয়’এর তাৎপর্য অধিকাংশেরই মর্মস্থলে প্রবেশ করেনি। বাউল-ফকির মেলায় গিয়ে হুল্লোড় করে, কেউ কেউ দু’ বেলা তাদের গান কর্ণস্থ করেও সে সবের মর্মকথা বুঝতে চায়নি। কারণ, মুসলমান ও তথাকথিত অচ্ছুতেরা যে আমাদের সমাজের অত্যন্ত সহজাত, বৈচিত্রময় ও ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা সর্বজনীন সহ-নাগরিক, সে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য ধর্মীয় মৌলবাদ ও বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে তীব্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও বৈপ্লবিক রূপান্তরের প্রয়োজন ছিল তা ব্যাপক অর্থে বঙ্গে কখনও হয়নি। সেই হেতু, খুব সামান্য ও বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ ব্যতীত, বঙ্গের রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সিংহভাগ নেতৃত্বে যেমন মহিলাদের স্থান খুব বিরল, তেমনই নিম্নবর্ণ ও মুসলমানেরাও কিন্তু নিখোঁজ। আর এই কারণেই ‘নাড়ু সিন্ড্রোম’এ আক্রান্ত বঙ্গজ বামেদের এক বড় অংশ অনায়াসে ভেবে ফেলতে পারে: ‘আগে রাম পরে বাম’।
ফলে, যা গেছে তা গেছে। এবার যাক সেই সমস্ত তথাকথিত ভদ্রবিত্তরাও, যারা আমাদের চারপাশে বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী সেজে কুৎসিত জিঘাংসা বুকে চেপে নিয়ত দংশন করছে আলোকময় চৈতন্য ও বোধকে। আজকের এই বিশেষ সময়ে তাদের যখন চিনতেও পারছি, অন্তত তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব তো তৈরি হোক। আপাতত সেটাই হতে পারে বৈপ্লবিক সামাজিক রূপান্তরের প্রথম ধাপ, যা আজও অসমাপ্ত থেকে গেছে। মনে করা যাক, এই জটিল-কুটিল সময়ে প্রকৃত নতুন বন্ধুদেরও কিন্তু কোনও অভাব নেই। একটু চোখ খুলে তাকান, রাস্তায় এসে অকুতোভয়ে দাঁড়ান।

