‘পান্ডালের ভিতরে যারা ছিল’

‘পান্ডালের ভিতরে যারা ছিল’

‘থিমের যদি দাপাদাপি…’

১৭ অক্টোবর ২০২৬, দুর্গা সপ্তমীর সন্ধ্যায় ঠাকুর দেখতে গিয়ে চোরবাগানে ২০ জন (সরকারি ভাবে ঘোষিত সংখ্যা) দর্শনার্থী ভীড়ের চাপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেলেন। এরকম ঘটনা কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এই প্রথম।

সপ্তমীর সন্ধ্যায় পুজো পরিক্রমা দেখব বলে টেলিভিশন খুলে দেখলাম প্রতিমা বা দর্শনার্থীর ভীড়ের  বদলে রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা জলের বোতল, জুতো, চটি-দুপাটি, একপাটি, নতুন অনেকগুলোই। মানুষগুলো যারা পুজোর নতুন জামায়, জুতোয় সেজেগুজে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল, তারা ভীড়ের চাপে পিষে মরেছে। সাত, তেরো, সতেরো, আঠারো, কুড়ি, পঁচিশ, তেত্রিশ, সাঁইত্রিশ, আটত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ ষাটের আশপাশে বয়স যাদের। 

এবার দুর্গাপুজোর সূচনাপর্ব থেকে আমরা সাধারণ বাঙালি ক্রমাগত শুনছি হুমকি আর নানা আদেশ।  সে আদেশ কখনও মুখ্যমন্ত্রী দিচ্ছেন তো কখনও ভিন রাজ্য থেকে আসা গেরুয়াধারী (যাকে আর যাই হোক সন্ন্যাসী বলা যায় না)। মধ্যপ্রদেশ থেকে উড়ে এসে আমাদের জ্ঞান দিয়ে গেছে, আমরা নাকি  ‘দুর্গা পান্ডালের নীচে নন ভেজকা ভোজন, গন্দে গন্দে ভোজন’ করি। আমরা হলাম ‘পাখণ্ডী’ (গুগল সার্চ করে এই ‘অপূর্ব’ শব্দের অর্থ খুঁজে পেলাম)। মুখ্যমন্ত্রী বললেন, একজন সন্ত এসেছিলেন, সন্তের মতো দেশপ্রেমের কথা, রাষ্ট্রবাদের কথা, অখণ্ড ভারত, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এটসেট্রা, এটসেট্রা…। ফলত তার ছবি পোড়ানো হয়েছে। আত্মসম্মান সম্পন্ন মানুষের এই কাজ মুখ্যমন্ত্রীর মতে নাকি সাঙ্ঘাতিক অন্যায় হয়ে গেছে। অতএব, স্বীয় পদাধিকার বলে মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দিলেন তাদের গ্রেফতার করতে। একজন গ্রেফতার হলেন। তো এরকম আবহে শুরু হয়েছিল এবারের পুজো। 

‘আমার মেয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে এসেছিল। একজন বান্ধবী ফোন করল আমাকে। মেডিকাল কলেজে নিয়ে যাচ্ছি আমরা। অক্সিজেন দিচ্ছে। তারপর কিছুক্ষণ বাদে ফোন করে বলল যে সাদা কাপড়ে ঢেকেছে। শ্রীপর্ণা আর নেই।’ প্রৌঢ় পিতার চোখে শূন্য দৃষ্টি। তিনি তখনও অবধি সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন না ঘটনার অভিঘাত। খাপছাড়া কয়েকটি বাক্য। আমাদের কানে বেজেই যাচ্ছে, শ্রীপর্ণা আর নেই, শ্রীপর্ণা আর নেই। আমাদের মনে হচ্ছে, আমাদের মেয়েও তো বান্ধবীদের সঙ্গে গেছে ঠাকুর দেখতে…

আমরা শুনছি ষষ্ঠী বা পঞ্চমীতে ঠাকুর দেখতে যাওয়া তরুণী ক্রোধে জ্বলতে জ্বলতে বলছেন, এত বড় ভিআইপি গেট। আর এইটুকু গেট সাধারণ মানুষের জন্য। সাধারণ এক তরুণীও আশঙ্কা করেছিলেন, সপ্তমী, অষ্টমীতে মানুষ পদপিষ্ট হবে।

– না আমি খুব হ্যাপি, মুখ্যমন্ত্রী বলছেন। এই কুড়িজনের অহেতুক মৃত্যুর পরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলছেন – না আমি খুব হ্যাপি। যে তেরোটা মৃত পরিবার(?) – আমার চোখের জল, ওদের চোখের জল দুটো-ই পড়েছে (এর অর্থ আমার বোধের বাইরে, বোঝার চেষ্টা করলাম না মিছে)। তারপর তিনি বললেন, তারা বলে গেছে যে মুখ্যমন্ত্রী আপনার ওপরে আমাদের আস্থা আছে, আমাদের আস্থা আপনার ওপর আছে। (এরকম করেই বললেন দুবার এক কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে)। ছেলেমেয়ে নিয়ে সপরিবার দুর্গাপুজোয় প্রতিমা দর্শন করতে গিয়ে প্রশাসনের চূড়ান্ত গাফিলতিতে যাঁরা চিরতরে প্রিয়জনকে হারালেন, শোকে পাথর যাঁরা, শববাহী গাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছেন সোনার পুত্তলিকে শেষবারের মতো কাঁচের এপার থেকেই এক মুহূর্ত দেখার জন্য, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীকে আস্থার কথা বলে এলেন গিয়ে?

দুর্ঘটনার পর জবরজং এক লাল পাঞ্জাবি, কপালে লাল তিলক, রাজ্যের মন্ত্রী উমেশ রাই নির্লিপ্ত ভাবে বলে গেলেন, ‘এখানে কোনও খুব বেশি কিছু হয়নি। দুর্গাপূজা ওখানে, কোন দুর্ঘট্টনা হয়েছে, কিছু ভেঙে পড়েছে এর’ম কিছু হয়নি।’ মন্ত্রী বললেন, ‘পান্ডালের ভিতরে যারা ছিল তারা বৃষ্টির জন্য বেরচ্ছে না আর বাইরে যারা ছিল তারা পান্ডালের মধ্যে ঢুকবে। এর মধ্যেই এস্ট্যাম্পিড হয়ে গেছে।’ 

‘Yes, and how many deaths will it take ’till he knows/ That too many people have died?’

ভিডিওতে দেখছি স্ট্যাম্পিডের ঘটনা শুরুর সময়ের ছবি। হুড়োহুড়ি, আর্তনাদ, মানুষগুলো যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। একজন, মাত্র একজন সাদা পোশাক পরা পুলিশকে দেখছি, কেবল একজন পুলিশ, এক হাতে কানে মোবাইল, আরেক হাতে থামার ভঙ্গি। কী থামানোর চেষ্টা করছেন তিনি? তীক্ষ্ণ আর্তনাদ মোবাইলের ভিডিওতে শুনতে পাচ্ছি। আসন্ন মৃত্যুর আশঙ্কার এমন চিৎকার ইতিপূর্বে শুনিনি জীবনে।আমার মেয়েটা আর আসবে না – অশ্রুবিহীন কান্না কত ভয়ঙ্কর!

কোনওরকম অ্যাম্বুলেন্স সামনে ছিলই না, কোনওরকম পুলিশ অফিসারও নেই। চোখের সামনে তাঁদের প্রিয়জন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। তাঁরা ভাবছেন একটা অ্যাম্বুলেন্স এলে, হাসপাতালে একবার পৌঁছে দিতে পারলেই গল্পটা পাল্টে যাবে। ভিডিও’র ছবি দেখতে দেখতে আমরাও খুঁজে চলেছি, বৃথা। 

‘At Kolkata`s Durga Puja Pandal, a father pulled 7 children out of a stampede, desperately looking for his son, Pranjal. But when he finally found him, he was lying lifeless, with a shoe print on his face.’

ময়না তদন্তের রিপোর্ট: ভীড়ের চাপে পাঁজর ভেঙে ফুসফুস ফেটে গিয়ে ৭ জনের মৃত্যু। ভিডিওতে দেখছি আহতদের নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় মানুষ। এক একজনকে চারজন পাঁচজন মিলে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনজন খাকি ও একজন সাদা পোশাকের পুলিশ তাঁদের পিছনে পিছনে চলেছেন। না গেলে ভালো দেখায় না তো, সেই হেতুই। 

অ্যাম্বুলেন্স নেই। পুলিশ নেই। ওলা বা উবের করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদিকে সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেছে দোষরোপের খেলা। প্রধান অভিযুক্ত নাকি বৃষ্টি আর থিম। এর আগে কখনও দুর্গাপুজোয় বৃষ্টি হয়নি। থিমের পুজোও না। 

বিজেপি নেতা কৌস্তুভ বাগচি বলছেন, পুজোয় সাত্ত্বিকতা মেনে আগামী বছর থেকে পুজো হোক, সম্পূর্ণভাবে সনাতনী। থিমের যদি দাপাদাপি, থিমের যদি চোখ রাঙানি, থিমের যদি হৈ-হুল্লোড় না থাকত, এতগুলো মানুষের প্রাণ বোধহয় যেত না। তবু ‘বোধহয়’ শব্দটা রাখলেন বাক্যে।  

আমরা সকলেই জানি, পুলিশ, দমকল, বিদ্যুৎ সরবাহকারি সংস্থা একাধিকবার এই মণ্ডপ পরিদর্শন করে ছাড়পত্র দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং পুজো উদ্বোধন করেছেন। আসন্ন বিপদের কথা আঁচ করার ক্ষমতা তাঁর হয়নি।

আমরা সকলেই পুজোর আগে থেকে মুখ্যমন্ত্রীর একের পর এক হুঙ্কার শুনেছি। দুর্গাপুজোর পরিবর্তে শারদোৎসব লিখলে পুজো বন্ধ করে দেওয়া হবে। পুজো মণ্ডপ চত্বরে বরাবর যে বইয়ের স্টল বসে, এবার তা বসতে দেওয়া হবে না। স্টল ভেঙে দেওয়া হয়েছে পুলিশ, বুলডোজার দিয়ে। পুলিশ একটুও কম পড়েনি সে বেলা। পুজোর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা গুজরাটি বা অন্য প্রদেশের কোম্পানির ভুলভাল বাংলায় লেখা বিজ্ঞাপন। সব হল, শুধু দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভাবলেন না তিনি। অতঃপর নিহতদের বাড়ি গিয়ে চেক প্রদান। সন্তানের মৃত্যুতে মায়ের হাতে চেক দিচ্ছেন আর বলছেন আগের সরকারের তুলনায় এই ক্ষতিপূরণ অনেকটা বেশি।

কলকাতা মেডিকেল কলেজে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী (যিনি কিছুদিন আগে অবধি সব বাজারে বাজরে ঘুরে চাতালে বসা ছোট ব্যবসায়ীদের তুলে দেবার হুমকি দিচ্ছিলেন) ঘোষণা করলেন, চোরবাগানের এই দুর্ঘটনায় আহতদের পরিবার চাইলে রোগীদের অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারেন। দয়ালু সরকার খরচ দিয়ে দেবে। হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তাররা তখন সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, কলকাতার অন্যতম সেরা এই সরকারি হাসপাতালে ট্রমা কেয়ার দূরস্থান, ৫ মিলি, ১০ মিলি সিরিঞ্জ অবধি নেই। এই কথার পর অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ওই জুনিয়র ডাক্তাররা যাঁরা রেফার নিয়ে কথা বলেছেন, তাঁরা সে সময়ে ডিউটিরত ছিলেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে, যেহেতু সেটা নিয়মের বাইরে ইত্যাদি, ইত্যাদি। তবে ওই সময়ে চোরবাগানে ভীড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং তাঁরা সঠিকভাবে ডিউটি পালন করেছিলেন কিনা, তা খতিয়ে দেখার প্রসঙ্গে কিছু বলেননি।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেব দিচ্ছেন, আগের সরকারের আমলে দেশপ্রিয় পার্কে কী হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে হড়পা বানে কী হয়েছিল। আরও আগে বামফ্রন্টের সময়কার কথা। আমরা শুনছি শোকের আবহে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, শুনছি আমরা – কখনও শুনেছেন ২৫ লক্ষ টাকা সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে? আমরা তো পুজোর ভীড়ে কলকাতায় এভাবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কথাও শুনিনি। মানুষ জানতে চাইছে, এই ঘটনার দায় কার। মহালয়ার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিপর্বে চারদিন রেড রোড বন্ধ রইল। দেড়শো কোটি টাকা দিয়ে ড্রোন উড়িয়ে, নাচ, গান করে মহালয়া (আদতে যা প্রয়াত পিতৃপুরুষের তর্পণের একটি শান্ত সমাহিত রীতিপালন) উদযাপন হল।

এই সব রণহুঙ্কার আর দেখনদারির চাপে মায়ের সন্তানরাই অকল্পনীয় যন্ত্রণায় মারা গেল। ড্রোন ওড়ানোর খরচ থাকে অথচ সরকারের গাফিলতির কারণে ঘটা দুর্ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স থাকে না। হাসপাতালে ডাক্তাররা চিকিৎসা করার উপকরণটুকু পান না। বেসরকারি হাসপাতালের পকেট ভরানোর ধূর্ত খেলা চলে এরকম পরিস্থিতিতেও। 

সাত বছরের সন্তান হারানো মায়ের জন্য, প্রাণের দীপ্তিতে টগবগে তরুণীর বাবার জন্যে, বোন হারানো দিদির জন্যে, মা হারানো সন্তানের জন্যে শেষতক পুজোর দিনে একগাছা সাদা মালা আর টাকার চেক। 

‘Yes, and how many ears must one man have/ Before he can hear people cry?’ 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *